ঘানিম

কে এই ঘানিম-আল-মুফতাহ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

একদিন তার ভূমিষ্ঠ হওয়া নিয়েই ছিল যথেষ্ট সংশয়-সন্দেহ। জন্মের পর দেখা গেল তার শরীরের নিচের অংশ নেই। অর্থাৎ জন্ম থেকেই দুই পা নেই তার। অথচ তার হাত ধরেই বেজে উঠলো এবারের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের ২২তম আসরের দামামা। বলছি পারস্য উপসাগরের দেশ কাতারের তরুণ ঘানিম-আল-মুফতাহের কথা। জীবনে অসংখ্য প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে তিনি বর্তমানে পরিচিত মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ইউটিউবার, বিখ্যাত মোটিভেশনাল স্পিকার ও মানবসেবী হিসেবে।

কোডাল রিগ্রেশন সিনড্রোম রোগে আক্রান্ত ঘানিম-আল-মুফতাহের শরীরের নিম্নাংশ না থাকা সত্বেও তিনি পুরো কাতার তথা আরব দুনিয়ার একজন রোল মডেল। কাতারের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত এবং বিখ্যাত একজন ব্যক্তি তিনি। তার অগণতি ভক্ত ও সমর্থক ছড়িয়ে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রান্তে। ঘানিমের বক্তব্যের মাধ্যমে উজ্জীবিত ও বর্ণময় হয়ে ওঠে হাজার বর্ণহীন জীবন।

ঘানিম যখন মাতৃগর্ভে তখনই আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনে ধরা পড়ে তার শরীরের অবিকশিত অংশ। চিকিৎসক গর্ভপাত করতে পরামর্শ দেন। কারণ, অপূর্ণাঙ্গ সন্তানের জন্ম দেওয়ার চেয়ে তাকে জঠরে হত্যা করে দেওয়াই শ্রেয় মনে করেন তিনি! কিন্তু ঘানিমের মাতা-পিতা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারলেন না। কারণ, ইসলামের বিধানে গর্ভপাত হলো চূড়ান্ত অপরাধ।

ঘানিমের মাতা ইমান-উল-আবদেলি এবং পিতা মুহাম্মদ-আল-মুফতাহ্ এটাকে মহান আল্লাহর সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিয়ে বিকলাঙ্গ সন্তানকে জন্ম দেন। এরপর ঘানিমের মা তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলেন- আমি হবো সন্তানের বাম পা আর তুমি হবে তার ডান পা। আমরা দুজনে সন্তানকে কখনো নিম্নাংশের অভাব টের পেতে দেব না।

২০০২ সালে মে মাসের ৫ তারিখে পৃথিবীর আলো দেখেন ঘানিম। শিশুকাল থেকেই পদে পদে সামাজিক বঞ্চনার শিকার হয়ে পড়েন তিনি। স্কুল, খেলার মাঠসহ সব জায়গায় তাকে অবহেলা, অপমানিত হতে হতো। তিনি এসবের তোয়াক্কা না করেই এগিয়ে যেতেন নিজ পথে, একেবারে নিজস্ব ছন্দে। বন্ধুদের বোঝাতেন ও বলতেন, তার অসম্পূর্ণ শরীরের জন্য তিনি মোটেও দায়ী কিংবা দোষী নন।। আল্লাহ তাকে যে পরিমাণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রদান করে পাঠিয়েছেন, এর জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।

নিজের সহপাঠী ও বন্ধুবান্ধব-কে এসব বোঝাতে বোঝাতে নিজের অজান্তেই তিনি হয়ে ওঠেন একজন মোটিভেশনাল স্পিকার। ঘানিম-আল-মুখতাহ্ প্রথমবার বিশ্ববাসীর সামনে হাজির হন ২০১৮ সালে, ১৬ বছর বয়সে। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত টেডএক্সের অনুপ্রেরণামূলক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে বিশ্বে আলোড়ন তৈরি করেন ঘানিম। এসময় তিনি বক্তব্যে তার কডাল রিগ্রেশন সিনড্রোম নিয়ে কথা বলেন। যে রোগে আক্রান্ত হলে বৃদ্ধি পায় না মানুষের শরীরের নিচের অংশ।

এই অর্ধেক শরীরি মানুষটাই আজ বিশ্ব দরবারে নিজের পরিচিতি তুলে ধরলেন। তিনি প্রমাণ করে দিলেন যে, শারিরীক প্রতিবন্ধকতা সাফল্যের পথে কোনো অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে না। প্রবল ইচ্ছা শক্তি আর পারপার্শ্বিক সহযোগিতাই মানুষকে অদম্য করে তোলে।

কাতারে আল-খোর অঞ্চলের আল-বাইত স্টেডিয়ামে ২০ নভেম্বর রোববার উদ্বোধনী পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপভোগ করে গোটা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা। জমকালো অনুষ্ঠানে ছিল নানা রকম চমক। ফিফা বিশ্বকাপের ৯২ বছরের ইতিহাসে এবারই উদ্বোধনী পর্বে প্রথম পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করতে দেখা যায়। পবিত্র কোরআন থেকে পাঠ করেন ফিফা বিশ্বকাপের শুভেচ্ছাদূত ২০ বছর বয়সী গানিম আল-মিফতাহ। গত এপ্রিলে গানিম আল-মিফতাহকে কাতারের পক্ষ থেকে ফিফা বিশ্বকাপের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নির্বাচন করা হয়।

কাতারি তরুণ তারকা ঘানিম আল-মিফতাহ ও মার্কিন অভিনেতা মর্গান ফ্রিম্যানের সংলাপের মাধ্যমে উদ্বোধন হয় এবারের ফিফা বিশ্বকাপ। পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে ফ্রিম্যান জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমরা সবাই একটি তাবুর নিচে একত্রিত হয়েছি। কীভাবে অনেক দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতি একত্রিত হতে পারে যদি শুধুমাত্র একটি পথকে গ্রহণ করা হয়?’ জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে একতা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে সুদৃঢ় করতে ঘানিম পবিত্র কোরআনের সুরা হুজরাতের ১৩ নং আয়াত পাঠ করে এর অনুবাদ করেন। তা হলো, ‘হে মানুষ, আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি নারী ও পুরুষ থেকে, আমি তোমাকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্ত করেছি যেন তোমরা পরষ্পরকে চিনতে পারো, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি সম্মানিত যে বেশি আল্লাহভীরু, আল্লাহ সব কিছু জানেন ও সব বিষয়ে অবগত। ’

এসময় ঘানিম বলেন, ফিফা বিশ্বকাপের একজন শুভেচ্ছাদূত হিসেবে আমি আশার, শান্তির এবং মানুষের মধ্যে ঐক্যের বার্তা পাঠাতে চাই।

কাতারের সর্বকনিষ্ঠ উদ্যোক্তা হিসেবেও পরিচিত ঘানিম। তিনি ঘারিসা আইসক্রিম প্রতিষ্ঠা করেছেন, এটি একটি কোম্পানি যার ৬টি শাখা রয়েছে এবং ৬০ জন কর্মী রয়েছেন। সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে তার ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি খুলতে চান ঘানিম।

এছাড়া ঘানিম তার পরিবারের সাহায্যে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গঠন করেছেন। তার মতো যারা পায়ে চলাচল করতে পারেন না, সংস্থাটি থেকে তাদেরকে হুইলচেয়ার উপহার দেওয়া হয়। মানবদরদি কাজের জন্য তিনি সারা পৃথিবীতেই পরিচিত। ২০১৪ সালে কুয়েতের আমি শেখ শাবাহ আল আহমদে আল শাবাহ তাকে ‘শান্তির দূত’ নামে অভিহিত করেন। এর আগে, ২০০৯ সালে টোয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি লিডার্স ফাউন্ডেশন কর্তৃক একজন আনসান হিরো বা অদৃশ্যে থাকা বীর হিসেবে স্বীকৃতি পান ঘানিম। বর্তমানে ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী গানিম।

ভয়েসনিউজ/এনএন

শেয়ার করুন: