চিলমারীতে আয়বৃদ্ধিমূলক কর্মকান্ডে পাল্টে যাচ্ছে চরাঞ্চলের মানুষ

চিলমারীতে আয়বৃদ্ধিমূলক কর্মকান্ডে পাল্টে যাচ্ছে চরাঞ্চলের মানুষের জীবন

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

‘হামরা চরের মানুষ জমি-জমা তেমন নাই, হামার শাক-সবজি চাষ করে লাভবান হচ্ছি এবং ভেড়া লালন-পালন করি হামার সংসারে আয় বাড়ছে। এই আয় দিয়ে ছাওয়া-পাওয়ার লেখাপড়ার খচর যোগার করছি’ – এ কথাগুলো বলছিলেন চিলমারী ইউনিয়নের মনতলা এলাকার শাহিদা আক্তার ও পারভীন বেগম।

বন্যা ও নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে প্রতি বছর অসংখ্য পরিবার গৃহহীন হয় কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষ। বিনষ্ট হয় চরের মানুষের কৃষি ফসল। ফলে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো পড়ে যায় চরম সংকটে। এমন পরিস্থিতিতে বন্যা ও নদী ভাঙ্গনের শিকার ৭৫০টি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ বাংলাদেশ। তারা দুর্যোগকালীন সময়ে ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তার পাশাপাশি পারিবারিকভাবে আয়বৃদ্ধিমূলক কর্মকান্ডে এগিয়ে এসেছে। আর তাদের সহযোগিতায় এসব পরিবার ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। সেই সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে তাদের জীবনমান।

কুড়িগ্রাম ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তাসহ ছোট বড় ১৬টি নদ-নদী বেষ্টিত জেলা। আর এসব নদীর বুক জুড়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৪শতাধিক চর। প্রতি বছর বন্যা ও নদী ভাঙ্গনের ফলে নিঃস্ব হয় এসব চরাঞ্চলের পরিবার। এই পরিবারগুলোকে বিভিন্নভাবে সহায়তা দিয়ে উন্নয়নমুখী হতে সহযোগিতা করা হচ্ছে। প্রশিক্ষণসহ পরিবারগুলোকে শীত ও গ্রীষ্ম মৌসুমে শাকসব্জির বীজ দেওয়া ছাড়াও ভেড়া বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও পাশে দাঁড়ান তারা বিভিন্ন দুর্যোগে।

বন্যাকালীন সময়েও যাতে সবজি উৎপাদন অব্যাহত থাকে সেজন্য কমিউনিটি ভিত্তিক সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করেছে সংস্থাটি। সবজি উৎপাদনে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন এবং ব্যবহারে সহায়তা প্রদান করছে। পরিবারগুলোর বন্ধন অটুট রাখার জন্য পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ ও আইনগত বিষয় নিয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হয়।

শনিবার চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় চর মনতলা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, এই গ্রামের ৩০টি বন্যা কবলিত পরিবার পারিবারিক আয়বৃদ্ধিমুলক কর্মকান্ড ছাড়াও সামাজিক উন্নয়নমুলক কাজে যুক্ত হয়েছেন।

চিলমারী ইউনিয়নের মনতোলা গ্রামের পারভীন বেগম জানান, আমাদেরকে সুশাসন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আমরা পারিবারিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, তালাকপ্রাপ্ত, বহুবিবাহ, পারিবারিক দ্বন্দ, সংবিধান, সংসদ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। এখন কোনো আইনি পরামর্শ প্রয়োজন হলে আমরা ফ্রেন্ডশিপের সহায়তা নিই এবং তারা আমাদেরকে বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ প্রদান করেন।

একই গ্রামের শামছুন্নাহার খাতুন ও মঞ্জুর রহমান বলেন, আগে হাট থেকে রাসায়নিক সার কিনে আনতাম, এখন আমরা জৈব সার তৈরি করে ব্যবহার করি, ফেরোমন ফাঁদ দিয়ে পোকা মারছি, সরকারি সুযোগ সুবিধা পেতে বিভিন্ন অফিসে যোগাযোগ করছি।

চিলমারী ইউনিয়নের মনতোলা গ্রামের শাহিদা আক্তার জানান, ফ্রেন্ডশিপের ট্রানজিশন ফান্ড প্রকল্প থেকে আমাকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে একটি ভেড়া দিয়েছে এবং সেটি থেকে ৬টি বাচ্চা হয়েছে। এখন তার সাতটি ভেড়া; যার বাজার মূল্য ৪০,০০০/-।

শাহিদা আরও বলেন, আধুনিক পদ্ধতিতে শাক-সবজি উৎপাদনের প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর আমার বসতবাড়ীতে সবজি উৎপাদন করে এ বছর ২২ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করেছি; যা আমার সাংসারিক ব্যয়ভার বহন করে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারছি। স্বামীর একার আয়ের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে না।

“ফ্রেন্ডশিপ” এর ট্রান্সজিশন ফান্ড (এএসডি) প্রজেক্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার কৃষিবিদ মোঃ আশরাফুল ইসলাম মল্লিক জানান, ফ্রেন্ডশিপ লুক্সেমবার্গ-এর সহায়তায় সদস্যদের আয় রোজগার নিয়মিতকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুশাসন এবং স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে উক্ত প্রকল্প সহায়তা প্রদান করছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাশীদুল হক জানান, কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী এবং রৌমারী উপজেলায় ফ্রেন্ডশিপের ট্রানজিশন ফান্ড প্রকল্পের মাধ্যমে এই বছরে ৭৫০টি পরিবারকে ভেড়া প্রদান করেছে এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে; ফলে পরিবারগুলোর ভেড়া পালনের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে অধিক আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রাণীসম্পদ দপ্তর থেকে প্রত্যেকটি ভেড়াকে টিকা এবং কৃমিনাশক বিনামূল্যে দেয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চর এলাকা ভেড়া পালনের জন্য উপযুক্ত তাই ভেড়া পালনের মাধ্যমে চরাঞ্চলের মানুষ স্বাবলম্বী হবে বলে আমি আশাবাদী।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কুমার প্রণয় বিষাণ দাসের সাথে কথা হলে তিনি জানান, উক্ত প্রকল্পটি সবজি চাষের প্রশিক্ষণ এবং সবজির বীজ বিতরণের মাধ্যমে চরের মানুষের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে এবং চরবাসীর জীবন মানের উন্নয়ন হচ্ছে।

শেয়ার করুন: